বুধবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণ

blood

ডায়াবেটিস একটি মেটাবলিক বা বিপাকীয় রোগ। আর আক্রান্ত রোগীকে এ রোগ বেশ বিপাকেও (বিপদে) ফেলে দিতে পারে। ডায়াবেটিস হলে রক্তের চর্বি বা লিপিডের মাত্রা খারাপের দিকে মোড় নেয়। ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএলের পরিমাণ কমে যায় আর খারাপ কোলেস্টেরল বা এলডিএলের মাত্রা বেড়ে যায়। রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রাও বেড়ে যায়। এ অবস্থাকে বলে ডায়াবেটিক ডিসলিপিডেমিয়া বা ডায়াবেটিসের জন্য রক্তের লিপিডের টালমাটাল অবস্থা। এতে হূদেরাগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে রক্তের লিপিডের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
সুতরাং, ডায়াবেটিসের কারণে হূদেরাগ ও স্ট্রোকের আশঙ্কা কমাতে হলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে রক্তের চর্বির মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শমতো রক্তের চর্বির মাত্রা পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে। এ পরীক্ষাকে বলে ‘লিপিড প্রোফাইল’।
লক্ষ্য স্থির করতে হবে এলডিএলের মাত্রা
ডায়াবেটিস হলে রক্তে এলডিএলের মাত্রা বাড়তে থাকে। রক্তে এলডিএলের মাত্রা বেশি থাকলে তা রক্তনালির দেয়ালে জমা হয়। রক্তনালির ভেতরটা সরু হয়ে যায়। এর ভেতর দিয়ে রক্ত সরবরাহ বিঘ্নিত হয়। হূৎপিণ্ডের রক্তনালি সরু হয়ে গেলে হূৎপিণ্ডের পেশি প্রয়োজনের তুলনায় কম রক্ত পায়। এতে হূদেরাগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে হলে স্ট্রোকের আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই সুস্থতার জন্য রক্তে এলডিএলের মাত্রা কমানো প্রয়োজন। প্রতি ডেসিলিটার রক্তে বা প্রতি ১০০ মিলিলিটার রক্তে এলডিএলের মাত্রা ১০০ মিলিগ্রামের কম হওয়া উচিত। ডায়াবেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে ৭০ মিলিগ্রামের কম থাকলেই ভালো। রক্তে এলডিএলের মাত্রা কম রাখতে পারলে হূদেরাগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি ২০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে যায়।
এইচডিএলের মাত্রা
ডায়াবেটিস হলে রক্তে এইচডিএলের মাত্রা কমতে থাকে। এইচডিএলের কাজ রক্তনালির দেয়াল থেকে জমে থাকা খারাপ কোলেস্টেরলকে সরিয়ে দেওয়া। তাতে রক্তনালির ভেতর দিয়ে সহজেই রক্ত প্রবাহিত হতে পারবে। তাই রক্তে এইচডিএলের মাত্রা কমে গেলে তা বাড়াতে হবে। পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রতি ১০০ মিলিলিটার রক্তে এইচডিএলের মাত্রা ৪০ মিলিগ্রামের বেশি আর নারীদের ক্ষেত্রে ৫০ মিলিগ্রামের বেশি থাকা প্রয়োজন। যত বেশি থাকে, তত বেশি ভালো। যদি ৬০ মিলিগ্রামের বেশি থাকে, তাহলে তা হূদেরাগ প্রতিরোধে কার্যকর বলে বিবেচনা করা হয়।
ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা
ডায়াবেটিসে রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রাও বেড়ে যায়। এর মাত্রা বেড়ে গেলে এলডিএলের মতোই তা রক্তনালির দেয়ালে জমা হয়। ফলে রক্তনালির ভেতরটা সরু হয়ে যায়। রক্তনালির দেয়াল শক্ত হয়ে যায়। সরু রক্তনালির ভেতর দিয়ে রক্তপ্রবাহ কমে যায়। হূদেরাগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। সুতরাং, রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমাতে হবে। প্রতি ১০০ মিলিলিটার রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা ১৫০ মিলিগ্রামের কম হওয়া উচিত। তাতে হূদেরাগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমবে।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে রক্তের লিপিডের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের উপায় হচ্ছে তিনটি মূলমন্ত্র:
শৃঙ্খলা
সব সময় কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে। এর মধ্যে আছে: নিয়মিত ব্যায়াম, পরিমিত ও সময়মতো উপযুক্ত খাবার আর ওষুধের প্রয়োজন পড়লে নিয়মিত ওষুধ সেবন বা ইনসুলিন গ্রহণ।
খাবারদাবার
শাকসবজি ও ফলমূল বেশি করে খেতে হবে। আঁশসমৃদ্ধ খাবারদাবারও বেশি খাওয়া উচিত। রিফাইন্ড শর্করা কম, অরিফাইন্ড শর্করা পরিমাণমতো খেতে হবে।
ওষুধ
ওষুধের প্রয়োজন পড়লে মুখে খাওয়ার ওষুধ খেতে হবে। আর ইনসুলিন ইনজেকশন দরকার হলে ইনসুলিন নিতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শমতো। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে রক্তের লিপিডের মাত্রা সঠিক রাখার চেষ্টার পাশাপাশি এলডিএল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমানো ও এইচডিএলের মাত্রা বাড়ানোর উপায় অবলম্বন করতে হবে। আর এসব করা যায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর মাধ্যমে:
খাবারে চর্বি গ্রহণে সতর্কতা
রান্নায় তুলনামূলক কম তেল-চর্বি ব্যবহার করা। কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার কম খাওয়া। স্যাচুরেটেড তেল, ট্রান্সফ্যাট কম খাওয়া; আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি খাওয়া।
নিয়মিত ব্যায়াম করা
সপ্তাহে পাঁচ দিন প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে দ্রুতলয়ে হাঁটা। বাড়িঘরের দৈনন্দিন কাজ নিজ হাতে করা। লিফটে নয়, হেঁটে সিঁড়িতে ওঠা। গন্তব্যে পৌঁছার একটু আগে রিকশা বা ট্যাক্সি থেকে নেমে বাকি পথ হেঁটে যাওয়া বা বাসা থেকে বের হয়েই রিকশা, ট্যাক্সিতে না উঠে একটু দূরে হেঁটে গিয়ে ওঠা—এসবের মাধ্যমেও বেশ ব্যায়াম হবে। ভালো কোলেস্টেরল বাড়বে, খারাপ কোলেস্টেরল কমবে।
শরীরের ওজন কমানো
ধীরে ধীরে শরীরের ওজন কমিয়ে স্বাভাবিক রাখা। এর ফলে শরীরের চর্বি কমবে, কোলেস্টেরলের মাত্রা ঠিক থাকবে।
আঁশযুক্ত খাবার
যেমন-শাকসবজি, লাল আটা, লাল চালের ভাতজাতীয় খাবার খাদ্যতালিকায় বেশি রাখা; খাদ্যের আঁশ রক্তের চর্বির মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে খুবই কার্যকর।
ধূমপান পরিহার করা
ধূমপান না করলে তাও রক্তের চর্বির মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক হবে।
মো. শহীদুল্লাহ
যথাসম্ভব লিফট পরিহার করে হেঁটে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠুন, নিজের অজান্তেই হয়ে যাবে ব্যায়াম
অধ্যাপক, বিভাগীয় প্রধান, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ, কমিউনিটি বেজড মেডিকেল কলেজ, ময়মনসিংহ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, নভেম্বর ০৭, ২০১২

রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ ও দাঁতের যত্ন

teeth

কীভাবে ডায়াবেটিস দাঁত ও মাড়ির ক্ষতি করে
দাঁত ও মাড়ির সমস্যা যে কারও হতে পারে। আপনার দাঁতের ওপর একটি চটচটে জীবাণু দ্বারা পূর্ণ আবরণ পড়তে পারে। রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ জীবাণু তৈরিতে সহায়তা করে। আপনি লাল, কালচে ও ফোলা মাড়ি দেখতে পাবেন, যা রক্ত ঝরাবে আপনি যখন ব্রাশ করবেন। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দাঁত ও মাড়ির সমস্যা প্রায়ই হবে, যদি তাঁদের রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকে। রক্তে অতিরিক্ত গ্লুকোজ দাঁত ও মাড়ির সমস্যা অধিকতর খারাপ করতে পারে। এমনকি আপনি আপনার দাঁত হারাতে পারেন। ধূমপান আপনার মাড়ির রোগটাকে আরও খারাপ করতে পারে।
যদি আপনার দাঁত ও মাড়ির ক্ষতি হয় কীভাবে তা বুঝবেন?
ডায়াবেটিসের কারণে আপনার দাঁত ও মাড়ির ক্ষত হতে পারে, যদি আপনার এক বা অধিক এই ধরনের সমস্যা থাকে—
 লাল, কালচে ও ফোলা মাড়ি
 মাড়ি থেকে রক্ত ঝরা
 মাড়ি দাঁত থেকে সরে আসবে সে জন্য আপনার দাঁতকে লম্বা দেখাবে।
 দুর্গন্ধযুক্ত নিঃশ্বাস
 দাঁতের কামড়, যা অন্য রকম মনে হবে
 কৃত্রিম দাঁত যদি ভালোমতো না লাগে।
কীভাবে আপনি আপনার দাঁত ও মাড়িকে সুস্থ রাখবেন
 রক্তের গ্লুকোজের পরিমাণ যতটা সম্ভব স্বাভাবিক মাত্রার কাছাকাছি
রাখতে হবে।
 দিনে অন্তত একবার হলেও ডেন্টাল ফ্লস (মাড়ি খিলালকরণ) ব্যবহার করতে হবে।
 নিয়মিত ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার দাঁতের ওপর চটচটে (ডেন্টাল প্লাক) আঠালো আবরণ পড়তে বাধা দেয়।
 যদি আপনি কৃত্রিম দাঁত ব্যবহার করেন সে ক্ষেত্রে সেগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে।
 আপনার দাঁতের চিকিৎসকের কাছ থেকে জানতে হবে কীভাবে দাঁত ব্রাশ ও ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে হয় এবং আরও জানতে হবে ব্যবহারের জন্য দাঁতের সঠিক ব্রাশ ও পেস্ট কোনটি।
 আপনার দাঁতের চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করুন যদি আপনার লাল, কালচে অথবা মাড়ি থেকে রক্ত ঝরে, মাড়ি যদি দাঁত থেকে সরে আসে, একটি কালশিটে দাঁত, যেটা সংক্রামিত হতে পারে অথবা আপনার কৃত্রিম দাঁত থেকে ব্যথা হতে থাকে।
 বছরে দুবার দাঁতের চিকিৎসক দিয়ে আপনার দাঁত ও মাড়ি পরিষ্কার করাবেন।
 দাঁতের চিকিৎসককে অবশ্যই আপনার ডায়াবেটিস আছে কি না জানাতে হবে।
 যদি আপনি ধূমপান করেন, চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে জানতে হবে কীভাবে ধূমপান ছাড়া যায়।
ডায়াবেটিস আক্রান্ত পুরুষ ও মহিলা রোগীকে প্রতিবার খাওয়ার পর দাঁত ব্রাশও ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে হবে।
মাহফুজুল হক খান
সহযোগী অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান, ডিপার্টমেন্ট অব ডেন্টিস্ট্রি, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, নভেম্বর ২১, ২০১২

কসমেটিক ডেন্টাল চিকিৎসা

dental2

একটা বয়সে এসে নিঃসঙ্গতা স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার জন্য সবাই এখন সচেষ্ট। আর তাই বিউটি পারলারে মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেরাও ভিড় জমায়। সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশে সুন্দর ঝকঝকে দাঁতের গুরুত্ব বলার অপেক্ষা রাখে না। সুন্দর হাসির মাধ্যমে মানুষ ঈর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু আমাদের মধ্যেই অনেকে নিজের হাসি লুকিয়ে রাখতে চাই, কারণ হিসেবে কাজ করে চারটি যুক্তিসংগত অবস্থা—বিবর্ণ দাঁত, এলোমেলো দাঁত, মুখে দুর্গন্ধ ও এক বা একাধিক দাঁতবিহীন মুখ। প্রত্যেক মানুষকে স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে, এসব অবাঞ্ছিত অবস্থার সুচিকিৎসা রয়েছে।
দাঁত বিবর্ণ হওয়ার কারণ দুটি, প্রথমটি বাহ্যিক; যেমন—নিয়মবহির্ভূত দাঁত পরিষ্কারের জন্য দাঁতের পৃষ্ঠে প্ল্যাক ও পাথর জমা, খাদ্যকণা, চা, কফি, ধূমপান, পান-সুপারি, ব্যবহূত পানিতে অধিক লৌহ ইত্যাদি আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ; যেমন—জন্মগত ত্রুটি, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, কিছু রোগ, দাঁতে আঘাত প্রভৃতি।
কারণ যা-ই হোক, দাঁতকে উজ্জ্বল সাদা রাখার ইচ্ছা সবার। বাহ্যিক কারণে দাঁত বিবর্ণ হলে বিজ্ঞানসম্মত স্কেলিং ও পলিশিংয়ের মাধ্যমে তা দূর হয়ে যায়। কিন্তু বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় ব্রিচিংয়ের। এ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট মাত্রায় হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রাসায়নিক পদার্থের মাধ্যমে দাঁতকে উজ্জ্বল করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য দেশেও এই পদ্ধতিকে ত্বরান্বিত ও অধিক কার্যকর করতে লেজার বা বিশেষ ধরনের রশ্মি ব্যবহূত হচ্ছে।
লেজার টুথ হোয়াইটেনিং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই দাঁতকে সাদা ও উজ্জ্বল করে।
এলোমেলো, উঁচু-নিচু বা ফাঁকা দাঁত নিয়েও অনেকের মনঃকষ্টের শেষ নেই। বংশগত কারণে চোয়ালের হাড় ও দাঁতের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা, সঠিক সময়ে দুধদাঁত না পড়া, আঙুল চোষার মতো আপত্তিকর অভ্যাস, জন্মগত কারণে দাঁতের নিজস্ব সম্পর্কের অস্বাভাবিকতা, দাঁত ফেলে দিলে অন্যান্য দাঁতের অবস্থান পরিবর্তন প্রভৃতি কারণে দাঁত এলোমেলো হতে পারে। শুরুতে অর্থোডন্টিক চিকিৎসার মাধ্যমে দাঁতকে সুন্দর ও সুসজ্জিত করা যায় সহজেই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসায় যেকোনো বয়সেই অর্থোডন্টিক চিকিৎসা গ্রহণ করা যায়।
মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে প্রথম এর কারণ খুঁজতে হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত মুখ পরিষ্কারের অভাবে দাঁতের ফাঁকে খাবার জমে মুখে দুর্গন্ধ হয়। অন্যান্য কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ধূমপান, ঘন লালা, শুষ্ক মুখ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি। অনেক সময় সাইনাস বা ফুসফুস সংক্রমণ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, লিভার, কিডনির রোগ প্রভৃতি কারণে মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে।
এ অবস্থায় ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ ও পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শমতো মুখ পরিষ্কার রাখলে বিব্রতকর এ সমস্যা এড়ানো সম্ভব।
দাঁত হারিয়ে ফোকলা মুখ নিয়েও মানুষের লজ্জার শেষ নেই। বিশেষজ্ঞরা প্রমাণ করেছেন, দাঁত হারালে শুধু সৌন্দর্যহানি হয় না; পাশাপাশি অপুষ্টি, উচ্চারণে অসুবিধা, খাদ্যের স্বাদ পরিবর্তন, এমনকি স্মৃতিশক্তি কমে যায় ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ে।
কৃত্রিম দাঁত সংযোজনের তিনটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির মধ্যে সর্বশেষ পদ্ধতিটি হচ্ছে ইমপ্ল্যান্ট সার্জারি। সর্বাধিক আরামদায়ক এই পদ্ধতিতে ধাতব দণ্ড বা স্ক্রু হাড়ের মধ্যে প্রতিস্থাপন করে তার ওপর কৃত্রিম দাঁত সংযোজন করা হয়। এর ফলে মানুষ কৃত্রিম দাঁতের উপস্থিতি অনুভব করতে পারে না।
দাঁত ভেঙে গেলে বা গর্ত হলে বন্ডিং কম্পোজিট ফিলিং দাঁতের সঙ্গে কৃত্রিম পদার্থের উপস্থিতি বুঝতে দেয় না। হুবহু দাঁতের রঙের সঙ্গে মিলে যায়।
মো. আসাফুজ্জোহা
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ডিসেম্বর ০৫, ২০১২

শ্রুতিবান্ধব ফোন

cell-phone

স্বাস্থ্যের ওপর মুঠোফোনের প্রভাব শুভ না অশুভ, এই নিয়ে দেশে দেশে গবেষণার অন্ত নেই। ব্রেন টিউমার এবং ইউভিয়ার ক্যানসারের জন্য অধিকতর ঝুঁকি সৃষ্টি হয়—এমন একটি ধারণা থাকলেও শক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
মুঠোফোন কাজ করে নন-আয়োনাইজিং রেডিয়েশন দিয়ে। আর ক্যানসার হয় আয়োনাইজিং রেডিয়েশন দিয়ে। রেডিয়েশন কথাটি শুনলেই ভয় পেয়ে যাই আমরা। তবু যতই থাক ভয়ভীতি, মুঠোফোন ছাড়া এখন কি আর কোনো কিছুই সম্ভব, সভ্যতা-সংস্কৃতি? প্রয়োজন শুধু সব প্রযুক্তির সতর্ক আর সুন্দর ব্যবহার। আসুন দেখি ফোনের কিছু সম্ভাবনার দিক।
ভিডিও টেলিফোন
যারা কানে কম শোনে তাদের পক্ষে টেলিফোনে কথা বলা বেশ কষ্টকর। কিন্তু যদি টেলিফোন কলটির সঙ্গে বক্তার ছবি দেখানো সম্ভব হয়, তাহলে এ কষ্টটা নিশ্চয় লাঘব হতে পারে।
সাইড টোন সচেতনতা
সাধারণ ফোনগুলোতে শ্রোতা মাউথপিস দিয়ে ঢোকা কিছু শব্দ ইয়ারপিসে আবার শুনতে পায়। যারা কম শোনে তাদের জন্য এই শব্দ আগে বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চাৎপটের অবাঞ্ছিত শব্দ এতে করে সাইড টোন হিসেবে ঢুকে পড়ে। তা ছাড়া রয়েছে লাইন নয়েজ বলে একটা অসুবিধা। এগুলো কমবে যদি শ্রোতা শোনার সময় মাউথপিসটিকে চেপে ধরে অথবা যেখানে মিউট বাটন দেওয়া থাকে, সেখানে তা পিটে দেয়।
হিয়ারিং এইড ও মুঠোফোন
হিয়ারিং এইডের সঙ্গে অনেকে সাধারণ ফোন ব্যবহার করে থাকেন। এতে ভালো শোনাও যায়। এ ক্ষেত্রে ইয়ারপিসকে এইড থেকে দূরে রাখলে শুনতে আরও সুবিধা হয়। ৪০ ডেসিবেল পর্যন্ত শ্রুতি বাড়ানো যায়, যদি একটি টেলিকয়েল দিয়ে ফোন এবং হিয়ারিং এইডের মধ্যে সংযোগ সাধন করা যায়। ফোন থেকে সরাসরি হিয়ারিং এইডে ইনপুট পাঠানো গেলে সেটি হতে পারে বেশ আকর্ষণীয়।
অ্যামপিমরফাইড হ্যান্ডসেট
এটি ব্যবহার করে ২০ ডিবির মতো বাড়তি শ্রুতি পাওয়া যায়। হ্যান্ডসেটগুলো পোর্টেবল বা ফিক্সড থাকতে পারে। এভাবে হিয়ারিং এইড ছাড়াই কাজে লাগতে পারে হ্যান্ডসেটগুলো।
এসএমএস
মুঠোফোনের শর্ট মেসেজ সার্ভিসটি বধির ও শ্রুতিকাতর ব্যক্তিদের ব্যবহার উপযোগী করে তোলার কাজ এগিয়ে চলেছে।
টেক্সট টেলিফোন
গভীরভাবে যারা বধির তাদের জন্য সহায়ক। এখানে আছে একটি কি-বোর্ড ও একটি পর্দা এবং এটি হচ্ছে একটি দ্রুতগামী ই-মেইল ব্যবস্থার মতো। একজন কমিউনিকেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট যদি রিলে স্টেশনে বসে মুখে বলা কথাগুলো টাইপ করে শ্রোতার কাছে পাঠিয়ে দেন, তাহলে এ ব্যবস্থা আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
ব্লু টুথ
কম পাল্লার সেট ব্যবহার করে টেলিফোন বা দূরবর্তী মাইক্রোফোনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এই প্রযুক্তি।
আলোর ব্যবহার
ঘরময় ফ্লুরেসেন্ট আলো ব্যবহার করে শ্রুতিসহায়ক একটি ব্যবস্থা সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে।
উপসংহার
সমাজে প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা সরলরৈখিক নয়। প্রাপ্যতা নিশ্চিত হওয়ার পরও জন-অংশগ্রহণ অনেক সময় ব্যাপকতা পায় না।
যেমন বলা যায়, টেলিভিশনে সাব-টাইটেল ব্যবহারের ব্যবস্থার কথা। নতুন উদ্ভাবনগুলোও অধিকতর গবেষণার পর গ্রাহকপ্রিয় হয়ে উঠবে কি না, তা বলে দেওয়া যায় না।
মিরাজ আহমেদ
মেডিকেল অফিসার, নাক-কান-গলা বিভাগ, মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা
মডেল: সামিয়া
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ডিসেম্বর ০৫, ২০১২

চোখ বেঁচে থাকবে চোখের আলোয়

eye

দুচোখ ভরা স্বপ্ন ছিল
তাঁর দুচোখ ভরা স্বপ্ন ছিল। স্বপ্ন ভরা জীবন ছিল। জীবনভর সংগ্রাম ছিল। আর এমন একটা জিনিস ছিল, যা আমাদের অনেকেরই নেই, থাকে না—‘কমিটমেন্ট’। মাত্র ৪৬ বছর বয়সী এক স্বপ্নবান ডাক্তারের গল্পের মতো অপ্রত্যাশিত অকালপ্রয়াণ এবং মানুষের জন্য ‘কমিটমেন্ট’-এর সত্য কাহিনি শোনানোর জন্যই আমার অশ্রুসিক্ত কলম চলছে আজ। প্রিয় পাঠক, আসুন, সেই মানবদরদি ডাক্তারের অল্প কিছু কথা জানি।
দেলদুয়ারের গাঁয়ের ছেলে
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের হিংগানগর গ্রামের ছেলে শিশির। তিন ভাই পাঁচ বোনের দারিদ্র্য-ক্লিষ্ট সংসারে ছোটবেলা থেকেই মেধাবী। পায়ে হেঁটে দূরের স্কুল আর সাইকেলে টাঙ্গাইলের কলেজ পেরিয়ে ১৯৮৫ সালে সুযোগ পান মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার। শুরু হয় বাবুল চন্দ্র দের ডাক্তার হওয়ার গল্প।
ময়মনসিংহের সংগ্রামী জীবন
পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ছিল না ছেলেকে হোস্টেলে রেখে মেডিকেলে পড়ানোর। ছেলে তো দমার পাত্র নন। টিউশনি করে, কোচিংয়ে পড়িয়ে নিজের খরচ নিজেই চালান আবার খরচ বাঁচিয়ে বাবা-মায়ের সংসারেও দেন। বাবা-ভাই কৃষি কাজ করেন, জমিতে সার লাগবে, বোনের বিয়ে, পুজোর কাপড়—সব কিছুরই জোগান দেন মেডিকেল ছাত্র।
সন্ধানীময় জীবন
নিজের পড়াশোনা, ছাত্রছাত্রী পড়ানো, রামকৃষ্ণ মিশনে যাওয়া দৈনন্দিন রুটিন। সচেতন ছিলেন, ছাত্ররাজনীতির পঙ্কিলতা ভালো লাগল না, তাই জড়ালেন মেডিকেল ও ডেন্টাল ছাত্রছাত্রীদের স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সন্ধানীর সঙ্গে। নিজে রক্ত দিয়েছেন ২৫ বারের বেশি (আমার জানা মতে)। ১৯৮৬ সাল থেকে স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানের আন্দোলনে একনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন।
মানবতাবাদী ডাক্তার
১৯৯২ সালে স্বপ্নপূরণ। ডাক্তার হলেন। হলেন সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির ময়মনসিংহ জোনের সাধারণ সম্পাদক। কখনোই ভোলেননি শিকড়ের কথা। নিজের গ্রামের মানুষের কাছে তিনি ছাত্রজীবন থেকেই ‘ডাক্তারবাবু’। টাঙ্গাইলের নিজের এলাকায় মানুষজন অসুখ-বিসুখে চলে আসতেন ময়মনসিংহে—তাঁদের দেখভাল, চিকিৎসা, ওষুধপত্র, কারও রক্ত লাগলে—সব ভরসা শিশিরবাবু। ‘মরণোত্তর চক্ষুদানে কোনো ধর্মেই বাধা নেই’—বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সেমিনার সংগঠক ছিলেন, মরণোত্তর চক্ষুদানের অঙ্গীকার করেছিলেন ছাত্রজীবনেই।
মরণোত্তর চক্ষুদান আন্দোলনে নিবেদিতপ্রাণ
বাংলাদেশে মরণোত্তর চক্ষুদান আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে কর্নিয়াজনিত অন্ধত্ব নিরাময়ে পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি। মানুষকে বোঝানো এবং মরণোত্তর চক্ষুদানের অঙ্গীকার করানো খুবই দুরূহ কাজ। কর্নিয়া সংগ্রহ করা আরও দুরূহ। মৃত্যুর ছয় থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে সংগ্রহ করতে হয়। অঙ্গীকার করলেও সব সময় কর্নিয়া সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না আত্মীয়স্বজন সহযোগিতা না করলে। তাই হাসপাতালের বেওয়ারিশ মরদেহ থেকেই কর্নিয়া সংগৃহীত হয় বেশি। মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর আত্মীয়স্বজনকে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে প্রণোদিত করে মৃত্যুর পর কর্নিয়া সংগ্রহ করার দুরূহতম মহৎ কাজটি করতে প্রথম সক্ষম হয়েছিলেন ডা. শিশির। আবার ঢাকার বাইরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অধ্যাপক আভা হোসেনের প্রথম কর্নিয়া সংযোজনের অন্যতম সংগঠকও ছিলেন তিনি। সিনেমা হলের টিকিট বিক্রি থেকে শুরু করে সন্ধানী লটারির আয়োজন—সবকিছুতেই তাঁর অবদান ছিল। আমরা কি কেউ ভেবেছিলাম, মানুষের চোখ চেয়ে চেয়ে অসময়ে নিজের দুই চোখ তিনি দিয়ে যাবেন— ‘কমিটমেন্ট’ রক্ষা করার জন্য!
দুই নয়নের মণি
তাঁর দুই কন্যা জয়িতা (১২) আর অর্চিতা (৭), তাঁর দুই নয়নের মণি। নিজে সারা জীবন কষ্ট করে পড়াশোনা করেছেন, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হয়েছেন, ছুটির দিনে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছুটে গেছেন প্র্যাকটিস করতে—স্বপ্ন ছিল দুই কন্যাকে নিজের মতো ‘মানুষ’ করবেন—ওদের যেন কোনো কষ্ট না হয়। ইচ্ছে ছিল নিজের গ্রামে একটি ছোট হাসপাতাল করে গ্রামের নারীদের চিকিৎসাসেবা দেবেন। মেয়েদের নিয়ে স্কুলের ছুটিতে বেড়াতে গিয়েছিলেন কক্সবাজার—ফিরলেন ২ জানুয়ারি ভোরে—বাসায় ঢুকে হঠাৎ বুকে ব্যথা, ঢলে পড়লেন। চিকিৎসার সুযোগও দিলেন না, যেন সমুদ্রস্নান সেরে পবিত্রযাত্রা করলেন পরপারে।
…স্বপ্ন দেখব বলে দুচোখ মেলেছি
মরদেহ ময়মনসিংহ থেকে টাঙ্গাইলে গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল। স্ত্রী, কন্যাসহ নিকটাত্মীয়রা বসে আছেন পরিচালকের কক্ষে, আর তাঁকে নিয়ে আমরা চক্ষু অস্ত্রোপচার কক্ষে। সন্ধানীর আমরা কজন তাঁর কর্নিয়া দুটো সংগ্রহ করব। সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির ‘আই ব্যাংক সমন্বয়কারী’ নিপুণভাবে কর্নিয়া সংগ্রহ করছেন—আমরা পাশে দাঁড়িয়ে। শিশির দা কি শেষবারের মতো তাকালেন? বললেন, স্বপ্ন দেখব বলে দুচোখ মেলেছি… আহ্ কী কষ্ট!
পরদিন ঢাকায় তাঁর কর্নিয়া দুটো প্রতিস্থাপিত হয়েছে—দুজন অপরিচিত মানুষের চোখে। এই দুজন মানুষ এখন এই পৃথিবীকে দেখবেন তাঁর দুই কর্নিয়া দিয়ে।
শুধু ধন্যবাদ নয়, বিনম্র শ্রদ্ধা তাঁর মা, স্ত্রী, কন্যাদ্বয় এবং ভাইবোনদের প্রতি। তাঁর অঙ্গীকার পূরণে সক্রিয় সহযোগিতার জন্য।
আসুন ডা. শিশিরের মতো আমরাও মরণোত্তর চক্ষুদানের অঙ্গীকার করি। আর তাঁর পরিবারের মতো সেই অঙ্গীকার পূরণে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসি।
আমাদেরও দায়িত্ব আছে…তাই স্বপ্ন দেখব বলে দুহাত পেতেছি
সারা জীবন কষ্ট করে যখন একটু সুখের মুখ দেখতে শুরু করলেন, বিধাতা তখনই তাঁকে নিয়ে গেলেন। সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে তাঁর গৃহলক্ষ্মী স্ত্রী আবারও কষ্টযাত্রা শুরু করবেন? দেশ-বিদেশে কত হূদয়বান, সামর্থ্যবান মানুষ আছেন—আমরা বিশাল সন্ধানী পরিবার আছি—দুই কন্যার লেখাপড়া, ভরণপোষণের জন্য আমাদের, সমাজের কি কোনোই দায়িত্ব নেই? আসুন, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই, দায়িত্ব পালন করি। তিনি কিন্তু দেখবেন দিব্যচোখে, তাঁর চোখের মণিদুটো বেঁচে থাকবে চোখের আলোয়।
(ডা. বাবুল চন্দ্র দে তহবিলে সহযোগিতা করতে চাইলে যোগাযোগ করুন সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি, ৮৬১৪০৪০ নম্বরে, ই-মেইল করুন iqbal5567@yahoo.com; অথবা snedsbd@gmail.com)
ডা. ইকবাল কবীর
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, জানুয়ারি ০৯, ২০১৩

ব্রণ থেকে মুক্তি পেতে…


bron
ব্রণ বা অ্যাকনি ত্বকের তেলগ্রন্থি বা সেবাসিয়াস গ্ল্যান্ডের একটি প্রদাহজনিত রোগ। ব্রণকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি রোগ হিসেবেই দেখা হয়। এর সুনির্দিষ্ট কারণ ও নিরাময়যোগ্য চিকিৎসাও আছে।
সাধারণত ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সে দেহে নানা হরমোনের ওঠানামার কারণে এ সময় ব্রণের প্রকোপ বেশি হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় এমনিতেই সেরে যায়। তবে প্রাপ্তবয়স্করাও যে ব্রণের ঝামেলায় ভোগেন না, তা নয়। ব্রণের আক্রমণের পেছনে বংশগত বা জেনেটিক কারণ যেমন দায়ী তেমনি হরমোনজনিত জটিলতা যেমন অ্যান্ড্রোজেনের প্রভাব, প্রসাধনসামগ্রীর ব্যবহার, জীবাণুর আক্রমণ, মানসিক চাপ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদিরও হাত আছে।
ব্রণ হলে সাধারণত চুলকানি থাকে না। তবে ব্যথা হতে পারে। কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে ৫ থেকে ১০ শতাংশ মেয়ে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম নামের একধরনের হরমোনজনিত জটিলতায় ভোগে। এদের ব্রণ বেশি হয়। এদের ওজন কমালে এবং চিকিৎসা করলে ব্রণ সেরে যায়। কারণভেদে চিকিৎসকেরা নানা ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন থেরাপি, অ্যান্টি অ্যান্ড্রোজেন, স্পাইরোনোল্যাকটন ইত্যাদি ওষুধ ব্যবহার করেন ব্রণের চিকিৎসায়।
তবে গর্ভবতী নারী বা সন্তানধারণে চেষ্টা করছেন এমন নারীদের ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা দরকার। প্রথম তিন মাস কোনো ধরনের ওষুধ না খাওয়াই ভালো।
ব্রণ হলে মুখের ত্বক খোঁটা উচিত নয়, এতে ত্বকে দাগ পড়ে যাবে। সব সময় ত্বক পরিষ্কার রাখতে হবে। অতিরিক্ত তেলজাতীয় খাবার বা ভাজা পোড়া এড়িয়ে চলতে হবে। যেকোনো প্রসাধনসামগ্রী ব্যবহারের আগে সাবধান হওয়া উচিত। ব্রণের কারণে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তা না করে সঠিক কারণ চিহ্নিত করুন। কোনো শারীরিক জটিলতা থাকলে তার চিকিৎসা নিন।
এম মনিরুজ্জামান খান, ত্বক বিশেষজ্ঞ
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৩

বয়স্কদের হাঁটুব্যথা

hatu betha

কয়েক দিন থেকে হাঁটুতে ব্যথা অনুভব করছিলেন চল্লিশোর্ধ্ব শফিক। বাড়ির সবার জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত গেলেন চিকিৎসকের কাছে। জানা গেল, লিফট নেই বেশ কয়েক তলা উঁচু বাসায়। তাই সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে গিয়ে তাঁর এ অবস্থা।
এমন ব্যথার কারণ
বয়স্কদের মধ্যে হাঁটুব্যথার প্রধান কারণ হলো অস্টিওআর্থ্রাইটিস, যা হাঁটুর অস্থিসন্ধির মধ্যকার তরুণাস্থির বয়সজনিত ক্ষয়ের ফলে হয়ে থাকে। এ ছাড়া হতে পারে আগের কোনো আঘাতজনিত ব্যথা, অস্থিসন্ধির সংক্রমণজনিত ব্যথা অথবা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস।
কী করবেন?
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল)-এর ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এম হাবিবুর রহমান বলেন, ক্রমাগত হাঁটুর ব্যথায় ভুগতে থাকলে জীবনযাত্রায় কিছুটা পরিবর্তন আনতে হবে। খাওয়ার সময় বসতে হবে চেয়ারে, নামাজ পড়তে হবে চেয়ারে বসে। গোসলসহ দৈনন্দিন সব কাজই উঁচু জায়গায় বসে করার অভ্যাস করতে হবে, যেন হাঁটুতে বেশি চাপ না পড়ে। বাথরুমেও ব্যবহার করতে হবে হাইকমোড। রান্নাবান্না, তরকারি কাটার মতো কাজও করতে হবে টেবিল বা কোনো উঁচু জায়গায়। ঘর মুছতে ব্যবহার করতে হবে লম্বা হাতলওয়ালা ঘর মোছার যন্ত্র। এ ছাড়া হাঁটুর কিছু ব্যায়াম (যেমন কোয়াড্রিসেপস এক্সারসাইজ) নিয়মিত করতে হবে। হাঁটুতে ব্যবহার করা যেতে পারে বিশেষ ধরনের ক্যাপ অথবা হাঁটার জন্য লাগবে লাঠির সাহায্য। আর ওজনটাও রাখতে হবে নিয়ন্ত্রণে।
তবে এসবে ব্যথা না কমলে নিতে হবে ফিজিওথেরাপি। তাপচিকিৎসার মাধ্যমেই অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে যান।
সিঁড়ি যদি ব্যবহার করতেই হয়
হাঁটুব্যথার রোগীদের সিঁড়ি ব্যবহার করতে হলে সিঁড়ির রেলিং ধরে ওঠানামা করতে হবে। প্রতিটি তলায় দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিতে হবে কিছুক্ষণ, এমনকি পারলে সিঁড়ির মাঝামাঝি স্থানেও বিশ্রাম নেওয়া উচিত। প্রতি পদক্ষেপে কখনোই একটির বেশি সিঁড়ি ভাঙা যাবে না। ডান হাঁটুতে ব্যথা থাকলে সিঁড়িগুলোতে প্রথমে বাঁ পা দিয়ে উঠতে হবে আর নামার সময় আগে ডান পা দিয়ে নামতে হবে। যাঁদের বাঁ হাঁটুতে ব্যথা, তাঁদের জন্য সঠিক পদ্ধতি হলো ঠিক এর উল্টোটা।
অস্ত্রোপচারও লাগতে পারে
এত কিছু মেনে চলার পরেও যদি কারও ব্যথা উপশম না হয়, তাহলে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) আর্থ্রোস্কোপি অ্যান্ড রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আবু জাফর চৌধুরী বলেন, যেসব অস্টিওআর্থ্রাইটিসের রোগীর হাঁটুতে খুব বেশি সমস্যা দেখা দেয়, অর্থাৎ শুধু ফিজিওথেরাপিতে যাঁদের ব্যথা উপশম হয় না, তাঁদের জন্য রয়েছে হাঁটুর সম্পূর্ণ অস্থিসন্ধি প্রতিস্থাপন করার চিকিৎসা। এই অস্ত্রোপচারের সাত দিন পরেই রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন। এরপর তিনি কোনো কিছুর সাহায্য ছাড়াই হাঁটতে পারবেন। মাস খানেক কিছু ব্যায়ামও করতে হবে তাঁকে। তবে এসব রোগী আর কখনোই সম্পূর্ণ হাঁটু ভাঁজ করতে পারবেন না।
প্রতিরোধের উপায়
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন। আর হাঁটুব্যথা সহনীয় পর্যায়ে থাকতেই জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন আনুন। তাহলে ভবিষ্যতে হাঁটুব্যথা আপনার জন্য দুর্দশা বয়ে আনবে না।
রাফিয়া আলম